ঢাকা ১২:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

নিজেকে অগ্রাধিকার দেওয়াই কি সুস্থ থাকার চাবিকাঠি? সুস্থ জীবন গড়তে যে ৭টি ‘স্বার্থপর’ অভ্যাস জরুরি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:০০:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২০ Time View

চারপাশের সমাজ আমাদের বারবার শিখিয়েছে, স্বার্থপর হওয়া মানেই খারাপ মানুষ হওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ধরনের স্বার্থপরতা এক নয়। একদিকে আছে অন্ধ স্বার্থপরতা, যেখানে সব পরিস্থিতিতেই কেবল নিজের কথাই ভাবা হয়। অন্যদিকে আছে বাছাই করা স্বার্থপরতা, যেখানে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের সুস্থতা ও মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের যত্নকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো অভদ্রতা নয়, বরং এটি শরীর ও মনের জন্য বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত। এই সাতটি তথাকথিত ‘স্বার্থপর’ অভ্যাস বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিতভাবে চাপ কমায়, শক্তি বাড়ায় এবং আপনাকে অন্যদের জন্যও আরও ভালো মানুষ করে তোলে।

নিজের সীমা টেনে ‘না’ বলতে শেখা
কতবার এমন হয়েছে, শরীর আর মন চাইলেও না, তবু সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে কোনো অনুষ্ঠানে যেতে হয়েছে? প্রয়োজনের সময় ‘না’ বলা আপনার সময় ও শক্তিকে সুরক্ষা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ সীমারেখা তৈরি করলে মানসিক ক্লান্তির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। অপ্রয়োজনীয় চাপ এড়িয়ে গেলে ঘুম ভালো হয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং মন থাকে স্থির। ভদ্রভাবে বলা, ‘এইবার পারছি না’, মোটেও অভদ্রতা নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তির জন্য উপকারী।
দেরি রাত নয়, ঘুমকে অগ্রাধিকার দিন
তরুণ বয়সে রাত জেগে কাজ বা বিনোদন সামাল দেওয়া সহজ হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রয়োজন বদলায়। নিয়মিত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। পর্যাপ্ত ঘুম কোষ মেরামত করে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুমের আগে আলো কমানো এই অভ্যাসকে আরও কার্যকর করে তোলে।

অন্যরা না বুঝলেও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া
বন্ধু বা সহকর্মীদের চাপ প্রায়ই আমাদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু নিজের পুষ্টির প্রয়োজন বুঝে খাবার বেছে নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, নিজে খাবার প্রস্তুত করলে শাকসবজি ও প্রোটিন গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির থাকে, ক্লান্তি কমে এবং মনোযোগ বাড়ে। আপনার থালা কী থাকবে, সে সিদ্ধান্ত আপনারই হওয়া উচিত।

প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নেওয়া
সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। শরীর ক্লান্ত থাকলে ব্যায়াম বাদ দিয়ে বিশ্রাম নেওয়া অনেকের কাছে স্বার্থপর মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষণা বলছে, জোর করে শরীরকে চাপ দিলে আঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। ক্লান্তির সংকেত বুঝে বিশ্রাম নিলে পেশি আরও শক্তিশালী হয় এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষমতা বাড়ে। মানসিক বিশ্রামও সমান জরুরি, প্রয়োজনে কাজ থেকে একদিন বিরতি নেওয়াও সুস্থতার অংশ।
অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন থেকে নিজেকে দূরে রাখা
দিনের ২৪ ঘণ্টা সবার জন্য উপলব্ধ থাকা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রেখে নিজের সময় ফিরে পেলে উদ্বেগ কমে এবং মনোযোগ বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল বিরতি ঘুমের মান উন্নত করে এবং সম্পর্ককে আরও গভীর করে। দিনের কাজ শেষে ফোন অন্য ঘরে রেখে বই পড়া বা গান শোনার মতো অভ্যাস মস্তিষ্ককে শান্ত করে।
বিষাক্ত সম্পর্কের সীমা টানা
সবাইকে খুশি রাখতে হবে, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসাই পরিণত হওয়ার একটি ধাপ। নেতিবাচক বা মানসিকভাবে ক্লান্তিকর সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, এমন সীমা টানলে বিষণ্নতার ঝুঁকি কমে এবং মানসিক দৃঢ়তা বাড়ে। উৎসাহ দেয় এমন মানুষের সান্নিধ্য আপনাকে আরও ইতিবাচক করে তোলে।
প্রতিদিন নিজের জন্য কিছু সময় রাখা
দিনে অন্তত ৩০ মিনিট শুধু নিজের জন্য রাখা মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। গোসল, লেখালেখি, ধ্যান বা নিছক বিশ্রাম, যা আপনাকে ভালো রাখে সেটাই বেছে নিন। এই অভ্যাস সৃজনশীলতা বাড়ায়, মানসিক ক্লান্তি দূর করে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করে। মনে রাখবেন, আপনি ভালো না থাকলে অন্যদের জন্যও সেরা রূপে হাজির হওয়া সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, নিজের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের ভিত্তি। বেছে নেওয়া এই ‘স্বার্থপর’ অভ্যাসগুলো আপনাকে ধীরে ধীরে আরও শক্ত, স্থির এবং সুখী মানুষ করে তুলতে পারে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

নিজেকে অগ্রাধিকার দেওয়াই কি সুস্থ থাকার চাবিকাঠি? সুস্থ জীবন গড়তে যে ৭টি ‘স্বার্থপর’ অভ্যাস জরুরি

Update Time : ০৬:০০:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

চারপাশের সমাজ আমাদের বারবার শিখিয়েছে, স্বার্থপর হওয়া মানেই খারাপ মানুষ হওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ধরনের স্বার্থপরতা এক নয়। একদিকে আছে অন্ধ স্বার্থপরতা, যেখানে সব পরিস্থিতিতেই কেবল নিজের কথাই ভাবা হয়। অন্যদিকে আছে বাছাই করা স্বার্থপরতা, যেখানে প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের সুস্থতা ও মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজের যত্নকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো অভদ্রতা নয়, বরং এটি শরীর ও মনের জন্য বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত। এই সাতটি তথাকথিত ‘স্বার্থপর’ অভ্যাস বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিতভাবে চাপ কমায়, শক্তি বাড়ায় এবং আপনাকে অন্যদের জন্যও আরও ভালো মানুষ করে তোলে।

নিজের সীমা টেনে ‘না’ বলতে শেখা
কতবার এমন হয়েছে, শরীর আর মন চাইলেও না, তবু সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে কোনো অনুষ্ঠানে যেতে হয়েছে? প্রয়োজনের সময় ‘না’ বলা আপনার সময় ও শক্তিকে সুরক্ষা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ সীমারেখা তৈরি করলে মানসিক ক্লান্তির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। অপ্রয়োজনীয় চাপ এড়িয়ে গেলে ঘুম ভালো হয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং মন থাকে স্থির। ভদ্রভাবে বলা, ‘এইবার পারছি না’, মোটেও অভদ্রতা নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তির জন্য উপকারী।
দেরি রাত নয়, ঘুমকে অগ্রাধিকার দিন
তরুণ বয়সে রাত জেগে কাজ বা বিনোদন সামাল দেওয়া সহজ হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের প্রয়োজন বদলায়। নিয়মিত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। পর্যাপ্ত ঘুম কোষ মেরামত করে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুমের আগে আলো কমানো এই অভ্যাসকে আরও কার্যকর করে তোলে।

অন্যরা না বুঝলেও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া
বন্ধু বা সহকর্মীদের চাপ প্রায়ই আমাদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু নিজের পুষ্টির প্রয়োজন বুঝে খাবার বেছে নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, নিজে খাবার প্রস্তুত করলে শাকসবজি ও প্রোটিন গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির থাকে, ক্লান্তি কমে এবং মনোযোগ বাড়ে। আপনার থালা কী থাকবে, সে সিদ্ধান্ত আপনারই হওয়া উচিত।

প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নেওয়া
সব সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। শরীর ক্লান্ত থাকলে ব্যায়াম বাদ দিয়ে বিশ্রাম নেওয়া অনেকের কাছে স্বার্থপর মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষণা বলছে, জোর করে শরীরকে চাপ দিলে আঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। ক্লান্তির সংকেত বুঝে বিশ্রাম নিলে পেশি আরও শক্তিশালী হয় এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষমতা বাড়ে। মানসিক বিশ্রামও সমান জরুরি, প্রয়োজনে কাজ থেকে একদিন বিরতি নেওয়াও সুস্থতার অংশ।
অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন থেকে নিজেকে দূরে রাখা
দিনের ২৪ ঘণ্টা সবার জন্য উপলব্ধ থাকা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রেখে নিজের সময় ফিরে পেলে উদ্বেগ কমে এবং মনোযোগ বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল বিরতি ঘুমের মান উন্নত করে এবং সম্পর্ককে আরও গভীর করে। দিনের কাজ শেষে ফোন অন্য ঘরে রেখে বই পড়া বা গান শোনার মতো অভ্যাস মস্তিষ্ককে শান্ত করে।
বিষাক্ত সম্পর্কের সীমা টানা
সবাইকে খুশি রাখতে হবে, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসাই পরিণত হওয়ার একটি ধাপ। নেতিবাচক বা মানসিকভাবে ক্লান্তিকর সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, এমন সীমা টানলে বিষণ্নতার ঝুঁকি কমে এবং মানসিক দৃঢ়তা বাড়ে। উৎসাহ দেয় এমন মানুষের সান্নিধ্য আপনাকে আরও ইতিবাচক করে তোলে।
প্রতিদিন নিজের জন্য কিছু সময় রাখা
দিনে অন্তত ৩০ মিনিট শুধু নিজের জন্য রাখা মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। গোসল, লেখালেখি, ধ্যান বা নিছক বিশ্রাম, যা আপনাকে ভালো রাখে সেটাই বেছে নিন। এই অভ্যাস সৃজনশীলতা বাড়ায়, মানসিক ক্লান্তি দূর করে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করে। মনে রাখবেন, আপনি ভালো না থাকলে অন্যদের জন্যও সেরা রূপে হাজির হওয়া সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, নিজের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের ভিত্তি। বেছে নেওয়া এই ‘স্বার্থপর’ অভ্যাসগুলো আপনাকে ধীরে ধীরে আরও শক্ত, স্থির এবং সুখী মানুষ করে তুলতে পারে।